আমরা সকলেই অবহিত আছি যে, দেশের চার লক্ষাধিক মসজিদের দশ লক্ষাধিক দায়িত্বশীল তথা খতীব, ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেম রয়েছেন। দেশের সর্ব প্রাচীন সংগঠন হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি মসজিদের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের নিকট সর্বাধিক পরিচিত ও তাদের নিকট সমাদৃত। খতীব, ইমাম ও মুয়াজ্জিনগণের পাশাপাশি শহরের কিংবা গ্রামের সকল মসজিদের একটি করে কমিটি রয়েছে। এছাড়া দেশের মসজিদ সমূহের সাথে কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। দেশের প্রায় সকল মসজিদের জায়গা ওয়াকফকৃত। এছাড়া সকল মসজিদের কম কিংবা বেশি আয়ের উৎস রয়েছে। অধিকাংশ মসজিদে মসজিদ কেন্দ্রিক মক্তব কিংবা হিফজখানা ও বড় বড় মাদরাসা বা দ্বীনি শিক্ষা কেন্দ্র রয়েছে। এ সকল প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হিসেবে রয়েছেন অনেক আলেম ওলামাগণ। সব কিছু মিলিয়ে দেশে মসজিদকেন্দ্রিক এক বিশাল কর্মযজ্ঞ অতীতে যেমন ছিল বর্তমানেও রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে 'ইনশাআল্লাহ'।
মসজিদে নববীর আদলে রাসুল (সাঃ) প্রদর্শিত পন্থায় মসজিদ কেন্দ্রিক সমাজ গঠনের এক মহান লক্ষ ও উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯৮৪ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক বিশাল ইমাম সম্মেলনে বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি গঠিত হয়। উক্ত সম্মেলনে দেশের সকল জেলার শীর্ষ স্থানীয় ইমাম ও খতীবদের উপস্থিতির কারণে একযোগে সারা দেশে জাতীয় ইমাম সমিতির কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ে। জাতীয় ভিত্তিক এই সংগঠনের বয়স বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রায় অর্ধশতাব্দী কাল। প্রায় চার যুগের এই সংগঠনের মেয়াদ কালকে কোন অবস্থায় কম সময় বলা যাবেনা। ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সহ আমাদের সংগঠনের হাজারো নিবেদিত প্রাণ নেতৃত্ব দুনিয়ার সফর শেষ করে মহান আল্লাহ্ তায়ালার ডাকে সাড়া দিয়ে পরকালে ঠাঁই জমিয়েছেন। আল্লাহ্ তায়ালা তাঁদের সকল খিদমাত কবুল করে তাঁদেরকে জান্নাতবাসী করুন।
এখন প্রশ্ন হল জাতীয় ইমাম সমিতি সুদীর্ঘ কাল সময়ে এর লক্ষ ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কতটুকু সফল হয়েছে? এ প্রশ্নের জবাবে সমিতির সফলতা ও ব্যর্থতার কিঞ্চিত আলোকপাত করে মূল আলোচনায় ফিরে যাব। বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটের আলোকে যে কোন সংগঠনের সফলতা ও ব্যর্থতার পরিমাপ করা খুবই দুরূহ কাজ। অরাজনৈতিক সংগঠনের ক্ষেত্রে তা আরও জটিল ও কঠিন। তবে জাতীয় ইমাম সমিতি একটি অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে এর যেমন কিছু সফলতা রয়েছে তেমনি ব্যর্থতাও রয়েছে। সফলতার মধ্যে যেমন,
ক) জাতীয় ইমাম সমিতির সাথে যুক্ত হয়ে দেশের সিংহভাগ ইমাম খতীব ও মুয়াজ্জিনদের নিয়ে একটি জাতীয় ভিত্তিক সংগঠন গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় আল্লাহ্ তায়ালার রহমতে আমরা সক্ষম হয়েছি।
খ) মসজিদে নববীর আদলে বাংলাদেশের মসজিদগুলোকে গড়ে তোলার লক্ষে আমরা আমাদের কর্ম পদ্ধতি বই আকারে এবং গঠনতন্ত্রে প্রকাশ করে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ইমামদের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছি।
গ) আমরা জাতীয় ইমাম সমিতির মুখপত্র হিসেবে একটি মাসিক/ত্রৈমাসিক প্রকাশনা বের করে কেন্দ্র থেকে অধঃস্তন শাখা সমূহের কর্মতৎপরতা ও সাংগঠনিক কার্যক্রম তুলে ধরার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।
ঘ) ইমামদের ও মসজিদ কমিটির মধ্যে পারস্পরিক দূরত্ব নিরসনকল্পে ইমামদের ক্ষমতায়ন এবং আর্থিক নিরাপত্তা বিধানের জন্য সর্ব প্রথম আমরাই ইমাম মুয়াজ্জিন তথা মসজিদের জনবলের জন্য "মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালার" খসড়া তৈরী করে সরকারের নিকট জমা দিয়েছি। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে খালেদা জিয়ার সরকার উক্ত খসড়া নীতিমালা সংশোধিত আকারে উপস্থাপনের জন্য ৭টি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেছিলেন। উক্ত কমিটির সদস্য সচিব করেছিলেন জাতীয় ইমাম সমিতির তৎকালীন মহাসচিব কাজী আবু হোরায়রাকে। পরবর্তীতে এ কমিটি কর্তৃক সংশোধিত নীতিমালা ধর্ম ও আইন মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের মাধ্যমে উপস্থাপিত হওয়ার পর মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক অনুমোদিত হয়ে গেজেট আকারে ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয়। ২০২৫ সালে তা পুনরায় সংযোজন বিয়োজনের মাধ্যমে দ্বিতীয় বার গেজেট আকারে পুনঃ প্রকাশিত হয়। এ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি জাতীয় ইমাম সমিতিই প্রথম সরকারের ও ইমামদের সম্মুখে তুলে ধরেছে। ইতিপূর্বে এ ধরণের কোন সার্ভিস রুল বা "মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা" নামে কোন ধারণা বা পরিকল্পনা কারো ছিলনা।
ঙ) শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশে ইমামদের জন্য বহুমুখী প্রশিক্ষণ চালু করেছিলেন। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ইমামদের মাধ্যমে মসজিদ ভিত্তিক নিরক্ষরতা দূরীকরণ কার্যক্রম সম্পাদন করা। কিন্তু তাঁর শাহাদাতের পরে এ উদ্দেশ্য ব্যর্থ হওয়ার উপক্রম হলে জাতীয় ইমাম সমিতির একটি প্রতিনিধি দল তাঁর সহধর্মিনী ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মরহুম বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে শহীদ জিয়াউর রহমানের সদিচ্ছার কথা স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি মসজিদ ভিত্তিক গণশিক্ষা কার্যক্রম চালু করে অর্থ বরাদ্দ দান করেন যা বর্ধিত আকারে আজও চালু আছে দেশের প্রায় আশি হাজার মসজিদে। তাতে ব্যাপক সংখ্যক ইমাম শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত আছেন এবং সম্মানী পাচ্ছেন।
চ) আমাদের দেশের অনেক বড় বড় পেশাজীবিদের কল্যাণে সরকার কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করেছেন। যেমন, সেনা কল্যাণ ট্রাস্ট ও মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ইত্যাদি। আমরা বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির পক্ষ থেকে দেশের ইমাম মুয়াজ্জিনদের জন্য "ইমাম মুয়াজ্জিন কল্যাণ ট্রাস্ট" গঠনের সর্ব প্রথম দাবী উত্থাপন করি। এ দাবী সরকারের গোচরীভূত হয় এবং সরকার "ইমাম মুয়াজ্জিন কল্যাণ ট্রাস্ট" গঠন করেন। বর্তমানে এর মূলধন প্রায় একশত কোটি টাকা।
ছ) বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি একটি অরাজনৈতিক সংগঠন হলেও ধর্ম মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ধর্ম ভিত্তিক কার্যক্রম সমূহের সাথে সম্পৃক্ত থাকার লক্ষে আমরা এর সকল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার চেষ্টা করি। বিশেষতঃ ইমাম প্রশিক্ষণ ও মসজিদ ভিত্তিক গণশিক্ষা কার্যক্রমে, যাকাত ও ইমাম মুয়াজ্জিন কল্যাণ ট্রাস্টের মত কার্যক্রম সমূহের সাথে সম্পৃক্ত থেকে আমরা সহযোগিতা দিয়ে থাকি।
এছাড়াও জাতীয় ইমাম সমিতির ছোট বড় আরও সাফল্যের অনেক উদাহরণ আছে। আমরা খুঁটিনাটি বিষয়ে বিতর্কে না জড়িয়ে "ইত্তেফাক মায়াল ইখতিলাফ" এ নীতিমালা অনুসরণ করে দেশের হকপন্থী সকল মাসলাক ও তরীকার অনুসারীদের জন্য ইমাম সমিতির দ্বার উন্মুক্ত রেখেছি। এখানে কওমী আলীয়া অথবা অন্য কোন আক্বীদা পন্থী বলে মতভেদ করিনা। তবে শিরক বিদয়াত পন্থীদের ক্ষেত্রে আমরা আপোষ করিনা। আপনারা জেনে খুশি হবেন যে, জাতীয় ইমাম সমিতির দুই উপজেলার সভাপতি সাম্প্রতিক কালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সংসদ সদস্য হয়েও তারা সমিতিতে আছেন। তারা যে দল থেকেই নির্বাচিত হোননা কেন সেটা বড় কথা নয়। তারা জাতীয় ইমাম সমিতির নেতা ছিলেন সেটাই আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও আমাদের সমিতির অনেকেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হবেন বলে আমাদের জানিয়েছেন। আমরা তাদেরকে বারণ করবনা। কোন বিতর্কে না জড়িয়ে নিজেদের যোগ্যতা বলে যদি তারা নিজের কর্মদক্ষতা ও যোগ্যতার বলে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতে পারেন তাহলে তারা সমাজ ব্যবস্থায় ন্যায়নীতি ও ইনসাফের সমাজ গঠন করে জনগণের মধ্যে আমূল পরিবর্তন আনতে পারবেন বলে আমরা মনে করি। আমরা বিভিন্ন সময়ে দেশে দুর্যোগকালীন বিভিন্ন জেলায় ত্রাণ বিতরণ, শীত বস্ত্র বিতরণ ও অসহায় ইমাম মুয়াজ্জিনগণের চিকিৎসা সাহায্য এবং ফিলিস্তিনী মুসলমানদের জন্য সাহায্য পাঠিয়েছি।
তবে প্রায় ৪৫ বছরের দীর্ঘ দিনের এই সমিতির অনেক ব্যর্থতাও রয়েছে। আমাদের সমাজ ব্যবস্থা, ইমামদের অবমূল্যায়ন, মসজিদ কমিটির অসহযোগিতা এবং আর্থিক সংকটের কারণে ইমাম সাহেবদের কাজ করার ক্ষেত্রে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাছাড়া আমাদের অযোগ্যতা এবং সমিতির জন্য সময়, মেধা ও শ্রম দানে গাফিলতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে আছি এটা স্বীকার করতে আমাদের কোন দ্বিধা নেই। কারণ আমরা এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকায় সমিতির একটি কমপ্লেক্স তৈরী করতে পারিনি। জেলায় জেলায় ও মহানগর সমূহে আমাদের সমিতির দায়িত্বশীলগণ নিজস্ব জায়গায় একটি অফিস বানাতে পারেননি। অনেক জেলার ইমাম সমিতি স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেননি। ইমাম মুয়াজ্জিনগণের জন্য গেজেট আকারে যে সার্ভিস রুল প্রকাশিত হয়েছে তা সংসদে উত্থাপন করে ইমামদের ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধানে তা আইনে পরিণত করতে পারিনি। ইমামদের ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধানে এখনও বাস্তব কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়নি। তবে এসব ব্যাপারে সরকার ও বিভিন্ন সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।
এখন আমি জাতীয় ইমাম সমিতির মাধ্যমে দেশের মসজিদ সমূহের সর্বস্তরের খতীব ও ইমাম সাহেবদের সদয় অবগতির জন্য কিছু স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী কর্মসূচি তুলে ধরছিঃ
স্বল্প মেয়াদী কর্মসূচি
ক) নিজ নিজ জেলা/মহানগর শাখার সংগঠনকে মজবুত করা। সকল উপজেলা/থানা ও ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড কমিটি গঠন করা। প্রতিটি ইউনিটের মাসে কম পক্ষে একবার কমিটির সভা আহ্বান করে কর্মসূচি গ্রহণ করা, সভার রেজুলেশন তৈরী করা ও কর্ম বন্টন করা। পরের মাসের সভায় পূর্বের মাসের গৃহীত কর্মসূচির বাস্তবায়ন নিয়ে পর্যালোচনা করা। সভাপতি ও সেক্রেটারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রত্যেক পদের দায়িত্বশীলদের তাদের পদের বিপরীতে কি কাজ করেছে তার জবাবদিহীতা নিশ্চিত করা। প্রয়োজনীয় সকল রেজিষ্টার ও ফাইল চালু করে তাতে কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করা। নিজ নিজ শাখার দায়িত্বশীলদের ঠিকানা, মোবাইল ও যোগাযোগের মাধ্যমগুলো সংরক্ষণ করা। একটি বসার স্থান/অফিস সকল শাখার জন্য নির্দিষ্ট করা এবং প্রত্যেক শাখার জন্য একটি ব্যাংক একাউন্ট করে ফান্ড জমা রাখা। আর্থিক সংকট দূরীকরণের জন্য প্রত্যেক সদস্যের একটি মাসিক চাঁদা নির্ধারণ করা। প্রত্যেক শাখার বিত্তবানদের একটি তালিকা করে তাদের সাথে যোগাযোগের ব্যবস্থা করা।
খ) মসজিদ কেন্দ্রিক সমাজ সেবা ও সমাজ উন্নয়নের লক্ষে কিছু কর্মসূচি চালু করা। যেমন, বড় একটি রেজিষ্টারে মসজিদের সীমানার মধ্যে যারা বসবাস করছেন তাদের পরিসংখ্যান সংরক্ষণ করা। কতজন শিক্ষিত কতজন অশিক্ষিত তাদের তালিকা সংরক্ষণ করা। কতজনের কর্ম সংস্থান আছে আর কতজন বেকার, কতজন ভিক্ষুক ও কতজন নিম্নবিত্ত কতজন বিকলাঙ্গ বা কাজ করতে অক্ষম ইত্যাদি তথ্য সংগ্রহ করে সমাজের নবীন প্রবীণদের সহযোগিতা নিয়ে পর্যায়ক্রমে সমস্যাবলির সমাধানের ব্যবস্থা করা। মসজিদ সমাজ গঠনের কাজ একটি দ্বীনি কাজ হিসেবে ফিকির ও চিন্তা ভাবনা করা সকল ইমাম ও খতীবগণের দায়িত্ব। এজন্য একটি সাহায্য তহবিল গঠন ও যাকাত আদায়ের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।
গ) ব্যক্তির উন্নয়ন ঃ বর্তমানে শিক্ষার হার অনেক বেশি। এখন জ্ঞানের প্রতিযোগিতায় ইমামগণ পেছনে পড়ে যাচ্ছে। মসজিদ কেন্দ্রিক সমাজ গঠনের জন্য ইমামের যোগ্যতা বৃদ্ধির কোন বিকল্প নেই। অচিরেই অযোগ্যরা সমাজ থেকে ছিটকে পড়ে যাবে। এজন্য প্রত্যেক ইমাম খতীবগণকে তাদের যোগ্যতা বাড়াতে হবে। প্রচুর লেখাপড়া করতে হবে। এজন্য প্রত্যেকের নিজস্ব একটি পাঠাগার থাকবে। কয়েকটি সূরা ও মুনাজাত বা দোয়া মুখস্ত করে নামায পড়ানোর দিন শেষ। এখন অনেক যোগ্য লোক তৈরী হচ্ছে। মসজিদ ভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য রাসুল (সাঃ) এবং সাহাবায়ে আজমাইন যেখানে যেতেন নিজের বাসস্থানের আগে সেখানে সর্ব প্রথম একটি মসজিদ নির্মাণ করতেন। মসজিদে রাসুল (সাঃ) একটি মিম্বর বানিয়ে এটা ইমামের জন্য একটি স্থায়ী মঞ্চ হিসেবে রেখে গেছেন। এ মঞ্চে বসে তিনি মসজিদের মুসল্লিদের নিয়ে একটি আদর্শ সমাজ একটি কল্যাণ মূলক সমাজ বিনির্মাণ করেছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে, ইমাম ও খতীবগণ সে দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছেন না। তাঁরা অজুহাত হিসেবে অনেক বাধা বিপত্তির কথা বলেন আসলে বুদ্ধিমত্তা, হিকমাহ্ জানা থাকলে এবং উদ্যোগী হলে সব কিছু না করতে পারলেও কিছু কাজ অবশ্যই তারা করতে পারবেন এবং ধীরে ধীরে তার জন্য অনেক পথ খুলে যাবে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا ۚ وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ
-"যারা চেষ্টা অব্যাহত রাখবে আমি তাদের জন্য অনেক রাস্তা খুলে দেব। এবং নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলগণের সাথে আছেন।" ইমাম ও খতীবগণের ব্যক্তিত্ব, যোগ্যতা ও বুদ্ধিমত্তা থাকলে তাদেরকে আল্লাহ্ তায়ালা অনেক পথ দেখাবেন এটা আল্লাহর ওয়াদাহ্। আল্লাহ্ তায়ালা আরও বলেন-
وَقُلِ اعْمَلُوا فَسَيَرَى اللَّهُ عَمَلَكُمْ وَرَسُولُهُ وَالْمُؤْمِنُونَ ۖ وَسَتُرَدُّونَ إِلَىٰ عَالِمِ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ
অর্থাৎ, "আর বলুন হে রাসূল তাদেরকে কাজ করতে ও চেষ্টা অব্যাহত রাখতে। আল্লাহ তায়ালা, তার রাসূল এবং মুমিনগণ তাদের কাজ দেখবেন। অতঃপর তোমাদেরকে সেই সত্তার কাছে ফিরিয়ে নেওয়া হবে যিনি গুপ্ত ও প্রকাশ্য সবকিছু জানেন। তারপর তিনি তোমরা যা করতে তা তোমাদেরকে অবহিত করবেন।" (সুরা আত-তাওবাহ:১০৫)
দীর্ঘ মেয়াদী কিছু কর্মসূচি
সমিতির দীর্ঘ মেয়াদী কর্মসূচি অনেক। কারণ খতীব ও ইমামগণের সত্যিকারের সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত যেমন আমাদের দাবীদাওয়া ও অধিকার আদায়ের জন্য চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে তেমনি মসজিদ ভিত্তিক সমাজ গঠনের আন্দোলন ও প্রচেষ্টাও অব্যাহত থাকবে।
দীর্ঘ মেয়াদী কর্মসূচি সমূহ ঃ
১। ইমাম, খতীব ও অন্যান্য ষ্টাফদের জন্য যে সার্ভিস রুল তথা চাকুরি বিধি "মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা" গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে তা আইনে পরিণত না করা অর্থাৎ সে পর্যন্ত সংসদে উত্থাপন করে আইনে পরিণত করে কার্যকর করা পর্যন্ত আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
২। ঢাকায় ইমাম সমিতির জন্য একটি কমপ্লেক্স তৈরী এবং সকল বিভাগীয় শহরে ও জেলা/মহানগর সমূহে সমিতির জন্য নিজস্ব জায়গা সংগ্রহ করে স্থায়ী অফিস ভবন ও কমপ্লেক্স তৈরীর চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। সরকারি খাস জমি, অথবা নিজস্ব অর্থায়নে জমি ক্রয় অথবা দানবীর ভূমি মালিকদের থেকে দানে/হেবায় জমি সংগ্রহের প্রচেষ্টা চালাতে হবে।
৩। জাতীয় ইমাম সমিতি ও মসজিদ কেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের যাবতীয় খবরাখবর প্রচারের জন্য সমিতির একটি ওয়েবসাইট খুলতে হবে।
৪। একই সঙ্গে সারা দেশে প্রতি জুমার বিষয় ভিত্তিক খুৎবা প্রচারসহ সার্বক্ষণিক ইসলামের প্রচার প্রসারের জন্য একটি ইমাম টেলিভিশন চ্যানেল চালু করার প্রচেষ্টা চালাতে হবে।
৫। ইমাম-মুয়াজ্জিন কল্যাণ ট্রাষ্টের একশত কোটি টাকার সাথে আরও সরকারি অর্থ বরাদ্দ দিয়ে একটি ইমাম কল্যাণ ব্যাংক নামে একটি ব্যাংক চালু করার জন্য সরকারি পর্যায়ে প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এক্ষেত্রে স্বচ্ছল ইমাম ও খতীবগণকে শেয়ার হোল্ডার হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে।
৬। সরকার মসজিদ ভিত্তিক গণশিক্ষা কার্যক্রমকে পর্যায়ক্রমে বর্ধিত করে প্রাইমারি স্কুলের ৩য় শ্রেণী পর্যন্ত এর আওতাভূক্ত করার জন্য জোর দাবি উত্থাপন করতে হবে। কারণ কিন্ডার গার্ডেন ও প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থীরা শিশুকাল থেকে ঐসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চলে যাওয়ার কারণে মসজিদ ভিত্তিক, মক্তব শিক্ষা বন্ধ হওয়ার উপক্রম দেখা দিয়েছে। সরকারকে যদি বুঝানো যায় যে, শিশুদের ইসলামী শিক্ষা দান, আদব কায়দা ও মূল্যবোধ শিক্ষা না দেয়ার কারণে আজ কিশোর গ্যাংসহ অনেক অপরাধে তারা জড়িয়ে পড়ছে। সুতরাং প্রাইমারী শিক্ষা তৃতীয় শ্রেণীর স্তর পর্যন্ত মসজিদের আওতায় নিয়ে আসলে সুনাগরিক গড়ে তোলা সহজ হবে। অপরদিকে ৪র্থ শ্রেণী থেকে ৭ম শ্রেণী পর্যন্ত মাধ্যমিক শিক্ষার একটি স্তর চালু করলে শিক্ষার মান ও বৃদ্ধি পাবে।
৭। জাতীয় ইমাম সমিতির মুখপত্র 'ইমাম বার্তার' মান উন্নয়ন করে এটিকে ব্যাপক প্রচার ও বাণিজ্যিক করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।
৮। জাতীয় ইমাম সমিতির সকল শাখার নেতৃবৃন্দ সমিতির অরাজনৈতিক নীতিমালাকে অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা জোরালোভাবে অব্যাহত রাখতে হবে। কোন অবস্থায় কারো রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততার সাথে ইমাম সমিতিকে সম্পৃক্ত করা সমীচীন হবে না। ব্যক্তিগতভাবে যে কেউ কোন দলের প্রতি সমর্থন বা সম্পৃক্ততা ভিন্ন কথা কিন্তু সমিতি অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে এর নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে।
৯। সমিতির সকল স্তরে স্থানীয় প্রশাসন, সরকারি আমলা, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে সমিতির নেতৃবৃন্দের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। সরকারের সকল মন্ত্রণালয়ের শাখা প্রত্যেক জেলা ও উপজেলায় রয়েছে। সেগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা মসজিদের ষ্টাফ ও দরিদ্র মানুষের জন্য আদায়ের চেষ্টা করতে হবে।
১০। ইমাম মুয়াজ্জিনগণকে শেয়ার হোল্ডার করে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন প্রকল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু করে ইমাম মুয়াজ্জিনগণের আর্থিক সচ্ছলতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চালাতে হবে। আল্লাহ তায়ালা সম্পদের নব্বই ভাগ রেখেছেন ব্যবসার মধ্যে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসা চালু করে অনেক মানুষ স্বাবলম্বী হচ্ছে। ইমামগণ আমানতদারীর সাথে এমন কিছু ব্যবসা চালু করতে পারেন যাতে বড় পুঁজির দরকার হবে না এবং বড় রকমের ঝুঁকিও নেই। মনে রাখতে হবে পৃথিবী অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। আর্থিক দৈন্যতা আপনাকে পেছনে ফেলে দিচ্ছে। পৃথিবীতে সম্পদের অভাব নেই। একটু কষ্ট করে আপনার ও পরিবারের উজ্জ্বল ভবিষ্যত তৈরী করা সওয়াবের কাজ। আমাদের আকাবেরগণের অধিকাংশই ব্যবসা করেছেন তারা কারো মুখাপেক্ষি ছিলেন না। আল্লাহ্ তায়ালা আমাদের বুঝার তৌফিক দিন।
ইমাম সমিতির জন্য আপনার সময় বরাদ্দ
একথা সত্য যে, আমরা সবাই কম-বেশি ব্যস্ত। এরপরও আমরা আমাদের সকল কাজের জন্য সময় বরাদ্দ রাখি। এ সমিতির একজন দায়িত্বশীল হিসেবে আপনার ও আমার সকলের নিকট একটি প্রশ্ন প্রতিদিন, প্রতি সপ্তাহে ও প্রতি মাসে সমিতির জন্য আমরা কতটুকু সময় বরাদ্দ করি? যদি আমাদের একটু সময় নিয়মিত বরাদ্দ রাখি তাহলে ইনশাআল্লাহ অবশ্যই সমিতি জেগে উঠবে, আল্লাহ তায়ালার সাহায্য আসবে, আমরাও আমাদের বিবেকের কাছে জবাবদিহি করতে পারব।
লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি